আঁকা নিয়ে

আমার ধারণা দুরকম বিষণ্নতা আছে। সৃষ্টিশীল আর সৃষ্টিছাড়া। এখন আমার দ্বিতীয়টায় পেয়ে বসেছে। আর হবেই বা না কেন ? একটা লাল নীল খুনখারাপি মার্কা ছবিকে শোধরাতে বসেছিলাম। সাদা অ্যাক্রিলিক ঢেলে ফ্যাকাশে করে দিলাম। সব লাল গোলাপি হয়ে গেল। তারপর ঘাবড়ে গিয়ে তাড়াতাড়ি রান্নায় ধনেপাতা দেওয়ার মত চাড্ডি কাগজের টুকরো ছড়ালাম। তাতেও সুবিধে হল না দেখে অ্যাক্রিলিক মডেলি; পেস্ট লাগালাম। কাগজটা হয়ে উঠল অপরাধবোধের মতই ভারি। তারপর যত্ন করে কাল থেকে পেন্সিল র;, প্যান প্যাস্টেল দিয়ে ছবির টেক্সচারকে স্পষ্ট করে তোলবার চেষ্টা করেই যাচ্ছি। ফলে ফ্যাকাশে গোলাপী কাগজের হাড়গোড় বেরিয়ে আর কিছু রইল না। এটার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে নিজেরই বলতে ইচ্ছে করছে, " ক্ষ্যামা দাও মা। অন্য কাজ করোগে যাও।"

২০১২ সালের ফেসবুক আপডেট। আজ হঠাৎ ফেসবুকই মনে করিয়ে দিল। 


দেশ

দেশ থেকে দেশে ঘুরে ঘুরে শুধু মরি,

সঙ্গ দিল না আমায় ‘সোনার তরী’ ।

সবার নৌকো হয় সোনা দিয়ে মোড়া ?

আমার তরীর হাল ভাঙা আগা-গোড়া ।

কবে যে শিকড় গজাবে সে কথা ভাবি।

 

শিকড় বাকড় নামাতেও ভয় লাগে –

কোন দেশ কার- কে মরবে কার আগে ।

কোনখানে হয় সোনার তরণী বাওয়া !!

সব দেশে পাই মৃত্যুগন্ধী হাওয়া।

ভোলা মন, কোন স্বপ্ন-মাটিতে যাবি ---

 

‘দেশ’এর ধারণা জট মেলে পাকে পাকে,

সেই জটে আজ শিকড় লুকিয়ে থাকে।

 

Pixlr-001(3)1qqqqqqqq


খারাপ বাংলা গান !!

আমি আর নুসরাত একবার ঠিক করেছিলাম বাংলা খারাপ গানের একটা সিডি বানাব । কিন্তু সেই খারাপ গানের বৈশিষ্টগুলো কী হবে সেই নিয়ে একমত হতে পারি নি আমরা।   খারাপ লিরিকের গানগুলো  আমাদের বেশ পছন্দ, কিন্তু নুসরাত আবার  চালু গান  লিস্টিতে ঢোকাতে দেবে না।  যেমন আশা ভোঁসলের গলায়, আর ডি বর্মনের সুরে, " লক্ষীটি দোহাই তোমার আঁচল টেনে ধোরো না"  গানটা  আমার এমন ন্যাকা লাগে যে  কী বলব। " কিন্তু এরকম ফেমাস , সুন্দর সুরের , বাজে লিরিকের গান আমরা হামেশাই গেয়ে থাকি। এইরকম করে অনেক গানই ঢোকানো হল না। আমাদের সিডিও হল না।

আজকে সেই না হওয়া সিডিতে যে গানগুলো ঢুকতে পারত, তার কয়েকটার কথা বলব। একটা গান সতীনাথের গলায় গাওয়া ( সতীনাথের গান আমার সত্যিই ভালো লাগে, মাইরি, মিথ্যে বলছি না) , আমার বোনের পছন্দের, " সারাটা জীবন পালঙ্কে শুয়ে কাটালাম/ তোরা এবার মাটিতে বিছানা কর/শ্বেতপাথরের দর-দালানটা ছেড়ে / এবার মাটিই যে হবে আমার শোবার ঘর।" এত বেশি সেন্টিমেন্ট, যেন চিনির রস জমে গেছে, আর লিকুইড থাকতে পারল না। দ্বিতীয় গানটা দ্বিজেন মুখুজ্যের ।  গানটার প্রথমে মাধবীর গলায় একটা ন্যারেশন ( নিশ্চয় সিনেমা টিনেমার গান ) " চললাম, আর সময় নেই, গাড়িটা ছেড়ে দিচ্ছে । জানি না, এই দেখাই শেষ দেখা কিনা । ভালোই হল, বলো ? শুধু মনে রেখো, আমি ছিলাম, আমি আছি, আমি থাকব।" তারপর ঘ্যাস ঘ্যাস করে ট্রেন ছাড়ার আওয়াজ। তারপর গানটা, দ্বিজেনের গলায় " হয়তো বসবে ধানের গোলাতে লক্ষ্মীপ্যাঁচাটি এসে/ ওই, দ্যাখো, দ্যাখো, বলে হাত তুলে মোরে, দেখাবে না আর এসে । সেই ভেবে জানি, কাঁদবে গো তুমি, হয়তো দেখবে লোকে/ তারা জানবে না কেউ কেন যে কাঁদছ, ভাববে কয়লা পড়েছে চোখে। " সিরিয়াসলি ??????  কয়লা পড়েছে ?  " হয়তো দেখবে লোকে"র সঙ্গে মিলিয়ে " কয়লা পড়েছে চোখে" বেরোল কবির হাত দিয়ে ? 

আর একটা গা্নের কথা বলছি , যেটা দিয়ে এই অ্যালবামটা শুরু হবে । এই গানটা সত্যিই আছে কিনা, জানি না। এটাও আমার বোনের কাছে শোনা । ও বলেছে শুধু দিল্লি সাইডে নাকি এ গানটা শুনতে পাওয়া যায়। ওর এক বন্ধু দিল্লি ঘুরে এসে এ গানটার কথা বলেছিল । এ গানের প্যারালাল আর কিছু পাইনি। " হায় রে হায়, হায় রে হায়, হায় রে হায় রে হায়/ গোমড়ামুখো দামড়াগুলো পাকা আমড়া খায়"। একটু আগে গুগুল করে একবার গানের সত্যতা যাচাই করে নিতে চাইছিলাম। কম্পিউটার হ্যাং করে গেল। 

পুনশ্চ ঃ ফেসবুকের বন্ধুদের কল্যাণে আরো কয়েকটা গান পাওয়া গেছে। 

১। " টুকুন, টুকুন, টুকুন/ তোমার মাথায় বাছব আমি ভালোবাসার উকুন" -সূত্র সম্বিত বসু।  আমি ঘোরতর সন্দেহ  প্রকাশ করবার আগে অন্য দুজন বন্ধু এই গান শুনেছে বলে সম্বিতকে সমর্থন করে ।

২। " চাঁদের হাসি ফিক ফিক ফিক, ওই উঠেছে আকাশে" - সূত্র  বুধেন্দ্র ভাদুড়ী । এখনও দ্বিতীয় কোনো সাক্ষী পাওয়া যায় নি এই গানের। 

৩। কোনো একটা গানের নাকি দ্বিতীয় লাইন হল এটা " ঝাল লেগেছে, ঝাল লেগেছে, ..." এবং তার সঙ্গে নাকি নায়িকার তিড়িং বিড়িং নাচ । - সূত্র সম্বিত বসু , এই গানটা যদি থেকে থাকে, তাহলে এটা কোনো রকমেই বাদ দেওয়া যায় না। 


বইয়ের বাক্য

বাংলা ভাষা শেখার বইতে কেমন সব বাক্য থাকে। ছোটোবেলায় বামনদেব চক্কোত্তির ব্যাকরণ বই পড়তাম । ' উচ্চতর বাংলা ব্যাকরণ'। ভালোই ছিল বইটা ।  স্নেহবশত স্ক্যান করতে গিয়ে দু-একটা বাক্য হঠাৎ চোখে পড়ল, " ছুরি দিয়া মাংস কাটিল, অস্থি কাটিল না।"   ভোঁতা ছুরির গল্প এমনভাবে শোনাতে হয় বুঝি ?   আমার মনের ভেতরটা সুবিধের না, ,  কল্পনায় এল একটা ব্যর্থ কাপালিক ছুরিতে শান দিচ্ছে আর নিজের মনে বিড়বিড় করে এই বাক্যটা বলছে। যাক, এটা না হয় আমার সমস্যা, বাদ দাও। আর একটা সেন্টেন্স এরকম, " কানে খাটো, চোখে কাণা, পায়ে খোঁড়া - এমন খুনীকে খুঁজে পাওয়া কিছু শক্ত নয়।"  যা বাবাঃ, এমন লোক বুকে বল নিয়ে আগে খুন টুন করুক, পালিয়ে যাক, তবে তো তাকে খুঁজে পাওয়ার কথা আসে ? বামনদেব এমনভাবে লিখেছেন যেন আকছার এমন খুনী চোখে পড়ে । 

বিদেশীদের জন্য লেখা বইগুলো আরো একটু করুণ মত । 'টিচ ইয়োরসেলফ বেঙ্গলি' বইতে উইলিয়াম রাদিচে ঢুকিয়েছেন, " নুন নিন, নিন না।"  একটু অবাক হয়েছিলাম প্রথম দিকে । নুন নেবার জন্য ভাই কী ঝুলোঝুলি ।  উনি তো লিখে খালাস। কালচারাল ব্যাকগ্রাউন্ডটা তো আমাকেই দিতে হবে। বাঙালিদের অনেক দোষ আছে, মানছি। জোর করে অতিথিদের খাওয়ায়, আমি আমার ছাত্রছাত্রীদের অতিথিসেবা থেকে কী করে বাঁচতে হয়, তার ট্রেনিং দিয়ে থাকি। কিন্তু পরম শত্রুও বলবে না, বাঙালিরা " নুন নিন, নুন নিন" বলে ঘ্যানঘ্যান করে ।

পরশু ক্লাসে দোনামোনা করে আমার এক ছাত্রী একটা বাক্য নিয়ে এসে দেখাল। পুরনো কোনো একটা বইয়ের লাইন। বিদেশীদের ভাষাশিক্ষার জন্য তৈরি হয়েছিল । ওর কাছে পুরো বইটা নেই, লেখকের নাম জানে না।  দুটো লাইন পরপর দেখলাম, প্রথমে বাংলায়, তার নিচে ইংরিজিতে লেখা , " নাপিত গাধাটাকে কামাইতে লাগিল।" " The barber started to shave the donkey." সে জানতে চাইছিল এরকম বঙ্গে  ঘটে থাকে কিনা, বা কখনো ঘটেছিল কিনা বা এর কোনো সাংস্কৃতিক গুঢ় তাৎপর্য আছে কিনা -মানে, পুজো-আচ্চায় গাধা কামানো হয় কিনা। 

বুঝলাম বাংলার পরামাণিকদের সম্বন্ধে আমার জ্ঞান খুবই সীমাবদ্ধ।

 

 


চিঠি লেখা

পৃথিবী জুড়ে পোস্টকার্ড, ইনল্যান্ড লেটারে চিঠি লেখার পরিস্থিতি কী জানি না। ইন্টারনেট আর মোবাইলের যুগে সম্ভবত মানুষ মানুষকে আর আয়েস করে চিঠি লেখে না। আমি তো আর লিখি না , এটুকু বলতে পারি। ফেসবুকে মেসেজ করি, হয়তো সেটার কাঠামো চিঠির মতই, কিন্তু কাগজে লিখে, স্ট্যাম্প লাগিয়ে, পোস্টাপিসে গিয়ে চিঠি ফেলে আসা আর হয় না। আমাদের হাইড পার্কে এখন একটা মাত্র পোস্টাপিস, সেখানে চমৎকার একটা আঁকা-বাঁকা মানুষের লাইন হয় আর আজকাল আমি খুব অধৈর্য টাইপের হয়ে গেছি। 
তবুও মেলবক্স খু্ললে একটু একটু খালি লাগে ।
আমি অবিশ্বাস্য পরিমাণে চিঠি লিখতাম একসময় । আর সেরকম পরিমাণে চিঠি পেতামও। স্কুল-কলেজে যেসব বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত দেখা হত, তাদেরকেও লিখতাম । আমার এত কী বলার ছিল জানি না । একবার কলেজে সুস্মিতা চৌধুরীকে আঠারো পাতার চিঠি লিখেছিলাম। সুস্মিতা ২২৩ নম্বর বাসে করে আমাদের কলেজ লেডি ব্রেবোর্ন অর্থাৎ পার্ক সার্কাস থেকে নাগেরবাজারে ফিরত। সে এক দুস্তর পথ ছিল আশির দশকে। সুস্মিতা বলেছিল, ‘ প্লিজ মন্দিরা, তুই এত বড় চিঠি আমাকে লিখিস না। কাল বাসের রাস্তা শেষ হয়ে গেল, তোর চিঠিটা শেষ হল না।‘
চিঠি নিয়ে আমি একটা সিরিজ লিখতে চাই। সে পরে হবে ।এখানে চিঠি নিয়ে দুজন লেখকের দুটো উদ্ধৃতি দেব। কলকাতায় সম্পূর্ণ সম্পর্করহিতভাবে বুদ্ধদেব বসুর ‘ আমার যৌবন’ আর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘অর্ধেক জীবন’ আবার পড়ছিলাম । দুজনেই চিঠি লেখাকে তাঁদের স্মৃতিতে কিছুটা স্থান দিয়েছেন। ভাবছি তাঁরা লিখে গেছেন বলেই সেই চিঠির স্রষ্টারা একটু গল্পের ভেতরে রয়ে গেলেন, নইলে চিঠি সংক্রান্ত এই গল্পগুলির চিহ্ন থাকত না কোথাও।
বুদ্ধদেব বসু দিলীপ রায়ের চিঠির কথা লিখেছেন। “ অবিরল চিঠি পাই তাঁর – বেগনি কালিতে ছোটো ছোটো অক্ষরে লেখা আট-দশ পৃষ্ঠা ফুলস্ক্যাপ পর্যন্ত লম্বা মাপের আর ক্কচ্চিৎ কখনো পোস্টকার্ড – একটি নয়, এক-দুই-তিন নম্বরে চিহ্নিত তিনখানা একসঙ্গে । দিলীপকুমারের ছোট্ট একটি কাজের কথাও কঙ্কালরূপে আবদ্ধ থাকে না । তাঁর লেফাফার মধ্যে চিঠি ছাড়াও নানা জিনিস থাকে : তাঁর নিজের কবিতা, আশ্রমবাসী সি ডি সেটনার ইংরেজি কবিতা, কিছু আনুষঙ্গিক কাগজপত্র বা শ্রীঅরবিন্দর কোনো টুকরো লেখন । আর থাকে অন্য কারো পত্র থেকে উদ্ধৃতি, বা সম্পূর্ণ মূল চিঠিখানাই – পুনশ্চ – কোনো তৃতীয় ব্যক্তিকে পাঠিয়ে দেবার অনুরোধসমেত : এমনি করে, শুধু চিঠিপত্রের ঘূর্ণন ঘটিয়ে দিলীপকুমার সেতু বাঁধেন অনেক পরিচিত ও অপরিচিতের মধ্যে, তাঁর নিজের ও অন্যদের বৃত্ত কেবল বিস্তীর্ণ করে তোলেন।“ ( পৃঃ ৬৯) বুদ্ধদেব দুঃখ করেছেন যে চিঠিগুলো তিনি যত্ন করে রেখে দিলেও পোকার আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে পারেন নি। সেগুলো গুঁড়ো হয়ে ধুলো হয়ে গেছিল। 
সুনীল যখন বিদেশে, সেই সময়ের কথা লিখতে গিয়ে সন্দীপনের চিঠির উল্লেখ করেছেন। “এরোগ্রামের চিঠিই সবচেয়ে শস্তা, আর সবচেয়ে বেশি সদ্বব্যবহার করতে জানে সন্দীপন । সে প্রথমে কালি দিয়ে লিখে পুরো জায়গাটা ভরিয়ে ফেলে তারপর তারই ওপর দিয়ে আবার লেখে পেন্সিলে । অর্থাৎ একই কাগজে দু’খানা চিঠি। কালিতে লেখা ও পেন্সিলে লেখার জন্য সন্দীপনের ভাষাও আলাদা হয়ে যায় …”( পৃঃ ২৬০) 

আমার কাছে এই দুই লেখা একসূত্রে গেঁথে গেল প্রধানত দৃশ্যগত কারণে ।

10947399_10155069846055363_1165154976240569339_o


শুয়োরের পাল ও একটা গানের ভিডিও

একসময় আমার একটা আমেরিকান প্রেমিক ছিল। তার খুব শখ জেগেছিল যে একটা গানের ভিডিওতৈরি করে এম টিভিতে পোস্ট করবে । তখন ইউ টিউব বাজারে আসে নি।  না, সে মোটে গান করতে পারত না ।  গানটা অন্য কেউ গাইবে, তার ভিডিও হবে এরকম যে সেএক পাল শুয়োরের মধ্যে ভ্যাবলা মুখে হাঁটছে ।  আমি তখন কলকাতায় থাকি।  সে আমাকে পিড়াপিড়ি করতে লাগল একপাল শুয়োর যোগাড় করেদিতে।  আমি শহরের লোক, শুয়োরের পাল তো দূরের কথা, একটা আসল শুয়োরকেও চিনি না।  ব্যাপারটাযদি ব্যাঙ্গার্থে হত, সে না হয় ভাবা যেত ।  সেই প্ল্যানটাতে আমি বিশেষ কিছু সাহায্য করতে পারিনি ।  তারপর তার বাই উঠল রিকশা চালাবে আর আমাকে তার ছবি তুলতে হবে।  ছেলেটা আবার ম্যারাথনে দৌড়োত । ( উফ, বড্ড খাটা –খাটনি গেছে সে সময়)। প্রেমময় হয়ে আমি তাকে সাহায্য করবার জন্য রাজী হলুম ।    প্রোজেক্টটা ম্যানেজেবল বলেই তখন মনে হয়েছিল।  অন্তত শুয়োরের পাল থেকে যে তার মন সরিয়ে নিয়েছে তাতেই আমি খুশি ।   ঠিক হল, ভোরভোর গড়িয়াহাটের মোড়ে রিকশাওয়ালা পাকড়াওকরতে হবে ।  আমিও উত্তর কলকাতা থেকে দক্ষিণকলকাতায় সকাল ছটা নাগাদ পৌঁছে গেলাম।  এরক মসন্দেহজনক কাজকারবারে কোনো রিকশাওয়ালাই রাজী হয় না । তারপর একজন নিরীহ লোককে বেশ কিছুটা পয়সা দিয়ে রাজী করানো গেল।  ছেলেটি রিকশাওয়ালাকে রিকশায় বসিয়ে টানতে শুরু করল ।  মিনিট দুই পরে রিকশাওয়ালার আতঙ্কিত মুখ দেখতে পেলাম ।  সে কাকুতি মিনতি করছে, “ নামিয়ে দিন বাবু, ভয় করছে । নামিয়ে দিন না…ও বাবু, আপনার পায়ে পড়ি। “ ম্যারাথন দৌড়বীর তখন বেজায় উৎসাহ পেয়ে গেছে। রিকশা নিয়ে সে দৌড় দিল বালিগঞ্জ ফাঁড়ির দিকে ।  দৃশ্যটা দাঁড়াল এইরকম – একজন বেঁটে খাটো সাহেব পা্গলের  মত রিকশা নিয়ে দৌড়োচ্ছে,আর পেছনে পেছনে ততোধিক বেঁটেখাটো এক মহিলা হাতে ক্যামেরা নিয়ে ছুটছে আর মাঝে মাঝে শাড়িতে পা জড়িয়ে হোঁচট খাচ্ছে ।  শেষে ‘ মহেশের মহাযাত্রা’র মত সে রিকশা বিন্দুবৎ হয়ে দিগন্তে মিলিয়ে গেল। আর আমি ক্যাবলার মত ক্যামেরা হাতে দাঁড়িয়ে রইলাম রাস্তায়।

জানি না তার শুয়োরের পালের মধ্যে হাঁটার সাধ পূর্ণ হয়েছিল কিনা।  সম্পর্কটা ভেঙ্গে গিয়ে ভালোই হয়েছিল।  অত পরিশ্রম বাপু বেশিদিন সহ্য করা মুশকিল।  


ক্লাস থ্রি

হুড়মুড় করে আজ বেথুন স্কুলের কথা মনে পড়ছে। ক্লাস থ্রিতে স্কুলে ভর্তি হয়েই আমার খুব ভালো লেগেছিল স্কুলটা। অনেকটা জায়গা জুড়ে স্কুল ক্যাম্পাস । বেশ সুন্দর সবুজ ঘাসে ঢাকা বড় মাঠ। একটা বিশাল বট না অশত্থ কী একটা গাছ ছিল, তাতে সন্ধ্যের মুখে বাদুরগুলো আকাশ কালো করে ঝাঁকে ঝাঁকে তাদের বাসায় ফিরে আসত। তাছাড়া কাঠচাঁপা গাছ ছিল, দেবদারু গাছ,কলকে ফুলের গাছও একটা ছিল ( কলকে ফুলের সুন্দর একটা নাম আছে, মনে পড়ছে না ঠিক এখন)   গেট থেকে ক্লাসে আসার পথে সেই সোনার বরণ হলুদ ফুল মাড়িয়ে মাড়িয়ে যেতে হত। থ্রি-ফোরের ক্লাস আমাদের চালাঘরে হত। মাটির মেঝে, টিনের ছাদ। কিন্তু কোনো কষ্ট হত না, জানলা দিয়ে সেই সবুজ ঢেউ ভরা মাঠটা চোখে পড়ত। বৃষ্টি পড়লে তো কথাই নেই। আমাদের কারোরই পড়াশোনায় মন বসত না। বৃষ্টি শেষ হওয়ার পরেও গাছপালা থেকে টপটপ করে ঝরে পড়ত উদ্বৃত্ত জল । অন্ধকার হয়ে যেত ক্লাসরুমগুলো। একবার ক্লাস না  করার উদ্দেশ্যে কে বা কারা যেন ঘরের বাল্ব খুলে নিয়েছিল।

 

আমাদের টিফিন খাওয়াটা একটা দারুণ ব্যাপার ছিল স্কুলে। ক্লাস থ্রি থেকে ক্লাস টুয়েলভ পর্যন্ত কখনো টিফিন নিয়ে যাই নি। গভর্নমেন্ট স্কুল, স্কুল থেকে খাবার দিত।  ছোটবেলায় বেশ ভালো ভালো খাবার খেতাম। লুচি-ছোলার ডাল, দরবেশের কথা এখনও মনে পড়ে। একবার আমাদের ড্রিলশেডে বসিয়ে ইলিশ মাছ দিয়ে ভাত খাওয়ানো হয়েছিল। জিভেগজা এখন আর তেমন দেখি না। স্কুলে রেগুলার খেতাম । খারাপ খাবারও দিত অবশ্য। আমাদের সবচেয়ে অপছন্দের খাবার ছিল গোলা ছাতু। সেদিনগুলোতে নর্দমা ছাতুতে ভরে যেত।

 

আমাদের সব ক্লাস অবশ্য চালাঘরে হত না। সায়েন্স বিল্ডিং ছিল, মেন বিল্ডিংও একটা ছিল। সে কী বড় বড় থাম, বড় বড় দরজা । বড় হলঘরটায় বেথুন সাহেবের শ্বেত পাথরের মূর্তিও ছিল। তাঁর মৃত্যুদিনে আমরা কালো বেল্ট পরে ‘কী দিয়া পূজিব তোমার চরণ, হে মহাদেবতা, হে মহাপ্রাণ” একটা গানের সঙ্গে মার্চ করার স্টাইলে হেঁটে গিয়ে ওই মূর্তির গলায় মালা দিতাম। বেথুন সাহেবের জীবন বা মৃত্যু নিয়ে আমাদের তত মাথাব্যথা ছিল না। ক্লাস থ্রিতে আমাদের যা টানত , তা হল বেথুন সাহেবের দুটো কুকুরের কবর যা আমাদের স্কুল গ্রাউন্ডের মধ্যেই ছিল। কবর বা শ্মশান যদি থাকে, তাহলে ভূতের গল্প আসবেই। আমরা মন খুলে সত্যি-মিথ্যা মিশিয়ে গল্প শুনে, গল্প বানিয়ে ভয় পেতে ভালোবাসতাম। কলেজের অংশটাও কীরকম রহস্যময় মনে হত।

 

পড়াশোনায় আমি তেমন ভালো ছিলাম না। আমি যত রাজ্যের বাইরের বই পড়তাম। সেদিন আমার মা স্কুলের রেজাল্টগুলো বার করে আমাদের দেখাতে যাচ্ছিলেন। আমার বোনের মেয়ে সামনে ছিল। আমি হাঁ হাঁ করে ঝাঁপিয়ে পরে সেগুলো কেড়ে নিলাম। এই বয়সে ওই সব নম্বর আমার বোনঝি দেখলে একেবারে লজ্জার একশেষ হবে। আমার জীবনে কোনো উদ্দেশ্যও ছিল না। খুব খারাপ ছিলাম অঙ্কে আর ইংরিজিতে। ইংরিজি আমার এতদিনেও ভালো হল না।

 

সাধাসিধে একটা জীবন কাটিয়েছি স্কুলে। টাকা-পয়সার ঠাটবাটকে পাত্তা দেওয়া হয় নি কোনোদিন। শিক্ষণ পদ্ধতির দিক থেকে বৈপ্লবিক কিছু ছিল না কিন্তু শিক্ষিকারা ফাঁকিবাজ ছিলেন না। যথাসাধ্য খাটতেন। একটা ব্যাপার শিখেছি সেই স্কুল থেকে, নিয়মানুবর্তিতা।যদিও কাল আড্ডায় দেরি করে পৌঁছেছি তবুও আমি সবসময় ঠিক সময়ে কোথাও পৌঁছুবার চেষ্টা করি। আমাদের হেডমিস্ট্রেস কোনো অজুহাত শুনতেন না, যদিও তিনি একটা অদ্ভুত মেক-আপ করতেন ও আমরা সেই দেখে গোপনে হাসাহাসি করতাম তবুও একটা কথা আমার মনে আছে, “ অনেক দূরে থাক, সেই কারণ দেখিও না। আগে বাড়ি থেকে বেরোবে। ঠিক সময়ে পৌঁছোবে ।“ আমাদের চুলে তেল দেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল, চুল বেঁধে যাওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। চুলে তেল দিতে আমার খুব খারাপ লাগত।  আমরা নানা কারণে শাস্তি খেয়েছি অনেক। অনেক সময় ক্লাসের বেশির ভাগ মেয়েকেই শাস্তি দিয়ে ক্লাসের বাইরে বার করে দেওয়া হত। তাতে আরো মজা পেতাম আমরা । বাইরে দাঁড়িয়ে হাসাহাসি করা যেত।

 

বাথরুমের সামনে একটা ভাঙা স্কুলবাস রাখা ছিল। দশ বছর স্কুল জীবনে সেটা একটু একটু করে বুড়ো হল। প্রথম দিকে আমরা মাঝে মাঝে তার ভেতরে গিয়ে খেলতাম। কিন্তু পরে তার সিটগুলো আরো ভালোভাবে নষ্ট হল। কাঠগুলো খসে পড়তে লাগল। একটা কঙ্কালের মত সেটা পড়ে থাকত বাথরুমের সামনে। একটা নির্জনতার মধ্যে, একটা ভাঙা বাস, গাছ থেকে নিঃশব্দে খসে পড়ছে পাতা । ঝিরঝিরে হাওয়ায় দেবদারু পাতা নড়ছে। এই দৃশ্যটা আজকাল মাঝেমাঝেই মনের মধ্যে ফিরে ফিরে আসে।


মাতৃবন্দনা

 

 আমি একটু অদ্ভুত । সেটা আমি জানি । আস্তে আস্তে বুঝতে পারছি আমার বাড়ির সবাই অদ্ভুত । তাদের মধ্যে মার কথা সবার আগে বলা উচিত । অবশ্য এটা আমার মার পড়া উচিত কিনা তা বলতে পারছি না । ভালো ভালো গুণগুলো আগে বলে নেওয়া দরকার । মার সাহিত্যপ্রীতি অসাধারণ । তেমন স্মৃতি । এখনও ফোন করে মাকে জিজ্ঞেস করি, “ মা , কোন অনুরূপা দেবী... ?” সেসব উত্তর মার কণ্ঠস্থ । বা;লা সাহিত্যের প্রশ্নের ক্ষেত্রে আমার মা আমার কাছে ‘ গুগুল সার্চ’ আর কি । এছাড়া সেলাইতে অনবদ্য । সেসব সূচিকর্ম আমার দ্বারা হল না । ওরকম সেন্স অফ হিউমার-ও আমি পাই নি । অবশ্য মা এই গুণটা মক্সো করেছেন আমাদের দিয়েই । আমি মার ব্যঙ্গ করার স্বভাবের জন্য নাম দিয়েছি, ‘ ব্যঙ্গমা’। মার একরকমের হাসি আছে, অনেকটা যাত্রার ভিলেন টাইপের, হা হা হা হা করতে করতে সেটা ধাপে ধাপে ওঠে । ছোটোবেলায় মামারবাড়ির সামনের গলিতে আমাদের পিট্টু খেলা মাঝে মাঝে বন্ধ হয়ে যেত ওই আওয়াজে । আমার বোনের এক বন্ধু আমাদের বাড়িতে এসে পাশের ঘর থেকে ওই শব্দে ভয় পেয়ে বোনকে বলেছিল, “ তোদের বাড়িতে কুকুর আছে নাকি রে ?”  

 

এসব আসলে ভূমিকা । আমার মার জীবনে ড্রাইভি; ফোর্স হচ্ছে কৌতূহল । ওটাই মাকে চালিয়ে নিয়ে যায় । প্রত্যেকের জীবনের গহনতম গোপন কথা শোনার জন্য মা মরে যান । কিন্তু প্রশ্নগুলো হয় খুব সাদা সাপটা, “ এই তোর সেক্স লাইফ আছে ?” এই রকম আর কি । আমার বোন বিবাহিত, তাকে প্রশ্ন করে মা সফল হয়েছেন । আমার ক্ষেত্রে নানাভাবে এই প্রশ্ন বহুবার এসেছে । অবশ্য আমার মা উত্তরের অপেক্ষা যে বিশেষ করেন, তা নয় । তাঁর নিজস্ব একটা থিয়োরি থেকে থাকে নানা বিষয়ে । সেইসব দিয়ে চালিয়ে যান । বাড়ির লোকেদের নানা রকম প্রশ্ন করে যে মা ক্ষান্ত হন তা নয় । পাশের বাড়ির লোকজন, ওপরের তলার লোকজন, ওইরকম ব্যস্ত হাহা করা বিবেকানন্দর রোডের আশে পাশের বাড়ির লোকজন, সকলের জন্ম-মৃত্যু-বিবাহ- আত্মহত্যা- ভগবান জানেন আর কী কী খবর, এসবই মার জানা আছে । ব্যাপারটা কতদূর যেতে পারে, সেটা বলার জন্যই এই লেখাটা । বিবেকানন্দ আর বিধান সরণির মোড়ের ট্র্যাফিক পুলিশকে মা জিজ্ঞেস করেছিলেন রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে, “ আচ্ছা, এতক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আপনার হাত-পা ব্যথা করে না ?” মোক্ষম প্রশ্ন । পুলিশ নিমেষে তার কাজ ফেলে মাকে বোঝাতে থাকে, “ আর বলবেন না মাসীমা, এই বাতের ব্যথায়...। আজ আপনি জিজ্ঞেস করলেন, কিন্তু কেউ তো বোঝে না , এই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে...” , সেদিন বিবেকানন্দ রোডের ট্র্যাফিকের কী হাল হয়েছিল তা বারান্দা দিয়ে নিজের চোখে দেখেছি ।  

 

ট্র্যাফিক পুলিশের ব্যথা বেদনা তো জানা হল । এবার মা পড়লেন ভিখিরিদের নিয়ে । একটু পাগল মত শান্ত মধ্যবয়সী এক ভিখারিণী আমাদের পাড়ায় ঘোরাফেরা করত । মা আকৃষ্ট হলেন কারণ সে পয়সা টয়সা চাইত না । কারোকে মনে রাখতেও পারত না । অনেকবার পুলকের সাথে মা আমার সঙ্গে সেই ভিখারিণীর পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন, এই যে আমার মেয়ে,” সে অত্যন্ত ভদ্রতার সঙ্গে স্মিত হেসে মাথা নেড়েছে প্রতিবার । মা তাকে ভিখিরিদের ট্রেড সিক্রেট সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছেন, “ তোমার এক জায়গায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিক্ষে করলে বেশি পয়সা ওঠে, না ঘুরে ঘুরে ভিক্ষে করলে?”। সেও মাকে বলেছে, “ ঘুরে ঘুরে ভিক্ষে করলে বেশি পয়সা পাই । “ মার প্রশ্ন, “ কোথায় থাক রাত্রে ?”। পাগলের উত্তর, “ নিরাপদ গলিতে।“ আমাদের পাড়ায় নিরাপদ নামের কোনো গলি অবশ্য নেই ।  

 

এই অবধি সহ্য করা যায়। কিন্তু মা অনেক দূর গেছেন ।  আমাদের পাড়ায় রাস্তায় মুর্গির দোকানটা যে উঠে গেছে, তার কারণ মা কিনা আমি জানি না, অবশ্য ঘোর সন্দেহ আছে আমার যে মা এ জন্য দায়ী । মুর্গি কিনতে গিয়ে মা দোকানদারটিকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “ এই যে আপনি রোজ রোজ জ্যান্ত মুর্গি কাটেন, আপনার কষ্ট হয় না ? ‘ মুর্গিওয়ালার হাতের ছুরি থেমে গেল, সে করুণ মুখে মার দিকে তাকিয়ে বলল, “ ওরকম করে বলবেন না মাসীমা।“ মা অবশ্য উচিত শাস্তি হাতে হাতে পেয়েছিলেন, পাশে দাঁড়ানো একটা লোক হি হি করে হাসতে হাসতে মাকে বলেছিল, “ মাসীমার লোভ আছে, অথচ মুর্গি কাটা দেখতে পারেন না । “ ফিরে আসি মুর্গিওয়ালার কথায় । পরের তিন চার দিন দোকান বন্ধ ছিল । মনে হয় মুর্গিওয়ালা ঘোর অবসাদের মধ্যে চলে গেছিল । তারপরে দোকানটা উঠেই গেল ।  

 

এছাড়া ছোটোখাটো প্রশ্ন লেগেই থাকে । মা একজন ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তিনি চুলে কলপ দেন কিনা । উত্তরটা এখন মনে নেই। হয়তো আর কারোকে জিজ্ঞেস করেছেন তার দাঁত বাঁধানো কিনা । কলকাতায় গেলে ভয়ে ভয়ে থাকি, এসব যেন আমার সামনে না হয় ।  

 

মার প্রশ্ন করতে যেমন ভালোবাসেন, খবর দিতে আরো ভালোবাসেন । মাঝরাত্তিরে আমাদের বারান্দায় দাঁড়ালে রাস্তার এক অন্য জীবন চোখে পড়ে । রাস্তায় কোন সমকামী একটা বুড়ো কোন একটা অল্পবয়সী ছেলের  বিছানায় গিয়ে শুয়েছিল, ব্রেকফাস্টের সময় আমাদের সেসবও শুনতে হয়েছে । বিশেষ করে অবিশ্বাস্য পরিমাণে মৃত্যুর খবর মার কাছে থাকে । আবার মার এরকমের বিশ্বাস আছে যে একটা মৃত্যুর খবর পেলে তিনটে মৃত্যুর খবর পেতে হয়। আজ অবধি প্রতি সপ্তাহে তিনটে মৃত্যুর খবর আমি পাই নি এরকম হয় নি । অনেক সময় এরকম হয়েছে অনেক দূর সম্পর্কীয় আত্মীয় মারা গেছেন, বাবা-মার দূর সম্পর্কীয় বন্ধুর বন্ধুর দূর সম্পর্কীয় আত্মীয় মারা গেছেন । ফলে গোড়া থেকে তাঁদের মৃত্যুর জন্য দুঃখ পেতে গিয়ে তাঁদের গোটা জীবন কাহিনী শুনতে হয়েছে । এসব করে বাবার সঙ্গে আর ফোনে ভালো করে কথা বলাই হয় না । বাবা একদিন বিরক্ত হয়ে মাকে বললেন, “ আরে, তোমাকে তিনটে মৃত্যুর খবর দিতে হবে না, কাল অনলাইন আনন্দবাজার খুললে অনেকগুলো মৃত্যুর খবর ও পেয়ে যাবে । এখন ফোনটা আমাকে দাও। আমি কথা বলি ।“ 

 

আর একটা বৈশিষ্টের কথা বলে আমি মাতৃকাহিনী শেষ করব । মা অন্যের গোপন কথা শোনার মত নিজের গোপন কথা বলতেও ভালোবাসেন । খুব গাম্ভীর্যের সঙ্গে আমি একটা গন্ডী প্রাণ দিয়ে রক্ষা করেছি । ওটা যে করেই হোক আজীবন রক্ষা করে যাব । আমার এক পিসি মাকে বলেছিলেন, “ ফ্রয়েড তোমাকে দেখলে অবাক হয়ে যেতেন, তোমার কোনো সাবকনশাস নেই।“ একদিন বিকেলে দেখলাম হাসিহাসি মুখে একটা মেটে লাল বিশাল শতরঞ্চি বগলে করে বাড়ি ঢুকছেন । আমি জিজ্ঞেস করলাম, “ সেকী ? কখন গেলে ? বলনি তো । “ মা বললেন, “ আরে, আত্মহত্যা করার ইচ্ছে হচ্ছিল । শতরঞ্চি কিনে মনটা ভালো হয়ে গেল । ফিরে এলাম কেমন হয়েছে , দেখ তো ।“ 

 

আশা করি কলকাতায় আত্মহত্যাপ্রবণ লোকের যেমন অভাব নেই, তেমন শতরঞ্চিরও অভাব নেই । 

 

 

 

 


আমার প্রথম প্রেমপত্র

নাঃ, আমার জীবনের প্রথম প্রেমপত্র আমার নিজের কোনো প্রেমিককে লেখা নয়। আমার বয়স হবে তখন সাত থেকে দশের মধ্যে। বাড়িতে যাঁরা কাজের দিদি বা মাসী ছিলেন, তাঁদের দেশে চিঠি লিখে দেবার ব্যাপারটা কেমন যেন আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়েছিল। আমি সানন্দে লিখে দিতাম, বিশেষ করে আহ্লাদে আটখানা হয়ে যেতাম যদি দেশে তাদের কোনো প্রেমিক থাকত। সবে বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ পড়ছি, বড়দের বই এটা সেটা করে পড়া হয়ে যাচ্ছে। মাথার মধ্যে কেমন করে যেন ঢুকে গেছিল প্রেমপত্র এক মহান ব্যাপার। সে নিজেরই হোক, আর পরেরই হোক। তাতে পারটিসিপেট করতে পারলে আর কিছু চাই না জীবনে ( সাত থেকে দশ বছরের জীবনে) আমার শব্দতালিকা ছিল বেশ প্রাচীনগন্ধী আর শুদ্ধ। তোমরা কমেন্ট করার আগেই আমি আমার সম্বন্ধে বিশেষণটা দিয়ে নিই। হ্যাঁ, “ পেছন পাকা” !!

কিন্তু সেই প্রথম প্রেমপত্র লেখার ব্যাপারটা এত যে কম্পলিকেটেড হবে সেটা বুঝতে পারি নি। আমি আমার সকল শব্দাবলী নিয়ে শিবানীদির চিঠি লিখতে বসেছি। আমি জানি সে চিঠিতে চাঁদ, চাঁদের আলো, বিরহ, অশ্রুপাত, মৃদুমন্দ বাতাস থাকতে হবে, সম্বোধনে থাকতে হবে “ প্রাণেশ্বর/ প্রানাধিক/ হৃদয়েশ্বর/ প্রাণনাথ” ইত্যাদি। শিবানীদি সোজা শুরু করল, ‘ রতনদা’ দিয়ে। তারপর চাঁদের কথা আনতে ঘোরতর বিরক্তি প্রকাশ করে বলল, “ তাহলে আমার ছাগলের কথা কখন জিজ্ঞেস করব ? জমি-জায়গার কথা ? আমি যা বলছি, তুমি লেখো তো।“ আমিও বেঁকে বসলাম। আমার ভোকাবুলারি আমি তাহলে ব্যবহার করতে পারব না ? যা বই টই পড়লাম, প্রেমপত্রে কোথাও জমি আর ছাগলের লেখা নেই।

শেষে রফা হল। যা শিবানীদি বলবে, তা আমাকে লিখতে হবে, এছাড়া আমি যদি আরো কিছু লিখতে চাই, তা ঢোকাতে পারব। শিবানীদি বলে যাচ্ছে। আমি ওর কথা তাড়াতাড়ি লিখে বাকি সময়টুকুতে আমার কথা ঢোকাচ্ছি। চিঠিটা দাঁড়াল অনেকটা এরকম।

প্রাণাধিকেষু রতনদা,

আশা করি সব কুশল। কী সুন্দর চাঁদ উঠেছে আকাশে। মৃদুমন্দ বাতাস বইছে। আমি তোমার জন্য বসে বসে অশ্রুপাত করছি। দিদিমা কেমন আছেন? তোমার বিরহে আমি কাতর। দিদিমা কি ছাগলদুটো কিনেছেন ? প্রাণেশ্বর, চাঁদের দিকে তাকিয়ে আমার কথাও কী তোমার মনে পড়ছে ? যদি টাকা কম পড়ে তাহলে মন্ডলবাবুকে বোলো আমি পরে আস্তে আস্তে দিয়ে দেব। 

আজ মাস খানেক হয়ে গেল তুমি যে সেই আমার কাছ থেকে দশ টাকা ধার নিলে আর শোধ দেবার নাম নেই। আসার আগে কতবার করে চাইলাম। হয় তুমি দশ টাকা আমাকে ডাকে পাঠাও, নয় দিদিমাকে দিয়ে দিও।  তোমার কথা ভেবে ভেবে অশ্রুবর্ষণ করে আমি শীর্ণ হয়ে গেলাম। ঘরের চাল ছাওয়া হল কিনা জানিও। তোমাকে ছাড়া প্রাণধারণ করা আমার পক্ষে কষ্টকর। আমাদের জমির অবস্থা কীরকম ? তোমারই তো দেখাশোনা করার কথা ছিল। শীঘ্র উত্তর দিও। টাকাটা কিন্তু দিয়ে দেবে। তোমার পত্রের আশায় সারাদিন বসে থাকি। আমাকে নিরাশ কোরো না প্রাণনাথ।

ইতি,

বিরহাতুর তোমার শিবানী


ভুল

 দ্বিতীয় ভাষা পড়া আর পড়ানোর মধ্যে মজা আছে প্রচুর, কারণ ভুল করার সম্ভাবনা আছে প্রচুর । আমি শিক্ষাতত্ত্বের মাথা খেয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের বলেই রাখি “ আমাদের ভুল থেকে হাসাহাসির ঢালাও সুযোগ আছে। তোমরাও হাসো, আমাকে হাসতে দাও।“  

 প্রথমে আমার ভুলগুলো নিয়ে কথা বলি । ভদ্রতা করে ।  ই;রেজিতে ‘পেন’ আর ‘পেইন’ আর এই ধরণের উচ্চারণগত পার্থক্য আমার কানে আলাদা করে ঢোকে না । মোটামুটি ভুল হলে ছাত্র-ছাত্রীরা আন্দাজ করে নেয় । মুশকিলটা হয়  পার্থক্যটা যখন প্রায় চরমে গিয়ে দাঁড়ায় । ‘ভর্তি করা’ শব্দটা বোঝাতে চাইছি ছাত্রদের ।  বলছি ‘fill up’, অন্তত ভাবছি যে বলছি ‘fill up’কিন্তু যত বলছি তত দেখছি যে ছাত্র-ছাত্রীদের ভুরু ব্রহ্মতালুতে উঠে যাচ্ছে, মুখে উদ্বিগ্ন একটা ভাব । আমি হাত –পা নেড়ে বোঝাচ্ছি, “ আঃ, ফীইইইইইল আপ”, “ ফীইইইইইল আপ” বুঝতে পারছ না ? “feel up” আর fill up’ এর উচ্চারণের তফাত তো করতেই পারি নি, ইয়ে, “feel up”এর মানেও জানতাম না । ছাত্র-ছাত্রীরাই যত্ন করে বুঝিয়ে না দিলে যে কী হত কে জানে । তার মানে কি এই যে আমি এখন ঠিকঠাক বলতে পারি ? মোটেই নয়, সাবধানতা অবলম্বন করে শুধু দৌড়ে গিয়ে বোর্ডে লিখে দিই, এই যা ।

 ই;রেজির ক্ষেত্রে  আরো দু-তিনটে মারাত্মক ভুল আমি যা করেছি, সেগুলো বলব কিনা ভাবছি । রম্য রচনার লেখকরা বেসিক্যালি ট্যাঁটন হয় , নিজের প্রফেশন নিয়ে খিল্লি করে না । আমি বর্ডার ক্রস করতে যাচ্ছি । অনেক, অনেক দিন আগেকার কথা । প্রায় কুড়ি বছর হল... প্রথম বিদেশীদের বা;লা পড়াতে ঢুকেছি । কোনো এক রকম বোকাবুদ্ধি বা অল্পবুদ্ধিতে ‘প্রেম করা’ শব্দটা বোঝাতে গিয়ে অনুবাদ করেছিলাম, “ In Kolkata, young people make love on the streets.”  এটা কলকাতায় বসেই । ভিরমি খেয়েছিল আমার ছাত্রছাত্রীরা । অনেক বাক্যবিনিময়ের পরে আলোচনা আয়ত্বে আসে ।  আর এই তো সেদিন, বছর পাঁচ-সাত আগে, আমি প্রথম পড়াতে এসেছি মিশিগানে । সেপ্টেম্বর মাসে স্নো বুট আর ডাউন জ্যাকেট পরে ( বরফ পড়তে শুরু করেনি তখনো । আমি ভেবেছিলাম লোকে সাবধানতা অবলম্বন করে যেমন ছাতা নিয়ে বেরোয়, তেমন বরফ পড়ার আগেই বোধহয় স্নো-বুট পরে বেরোতে হয় । )  বিচিত্র সাজে ক্লাসে গিয়ে এদিক-ওদিক তাকিয়ে বলেছিলাম, “ এই দেশটা অদ্ভুত ।“  অদ্ভুতত্বের নানা উদাহরণ দিয়ে এক জায়গায় বলেছিলাম, “ I don’t see dead people on the streets.” বলেই বুঝেছিলাম, মারাত্মক কেলো হয়ে গেছে । বলতে চেয়েছিলাম, যে রাস্তায় লোকে মড়া নিয়ে যায় না । এই গল্প গ্রিক ডিপার্টমেন্ট অবধি পৌঁছেছিল । এফ্রোডিটি নামে একজন গ্রিক শিক্ষিকার সঙ্গে কীভাবে যেন আলাপ হওয়ার পর উনি হাসিহাসি মুখে আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “ ওঃ, আপনিই কলকাতা থেকে এসেছেন ?”

 এবার আমার ছাত্র-ছাত্রীদের প্রমাদের কথায় আসি ।  আমার কাজই হল ভুল ধরা । ভুলের একটা প্যাটার্নও থাকে ।  যেমন এখন আমি জানি, এই বাক্যগুলোয় আমার শান্ত ছাত্রীটি কী বলতে চেয়েছিল, “ ভদ্রলোকের চারটে মেয়েছেলে আছে” বা “ ছেলেরা বাল নিয়ে খেলতে ভালোবাসে” । ‘ছেলেমেয়ে’ শব্দটা উলটে গেলে বা বল-এ একটা এক্সট্রা আ-কার দিলে যে অর্থের পৃথিবী ওলটপালট হয়ে যায়, এসব ঠেকে শেখা ।   

 হোমওয়ার্কে ভুল পেলে আমি বাড়িতে একচোট হেসে নিই । কিন্তু ক্লাসে ঠিক তৈরি হওয়ার সময় পাই না । ‘বেচা’ ক্রিয়ার কনজুগেশনে ছ জনের মধ্যে যখন পাঁচজনই বোর্ডে লেখে “ আমি বিচি”,  “ এই সূত্রে তিনি বলেছেন...” পড়তে গিয়ে  কেউ পড়ে, “ এই মূত্রে তিনি বলেছেন...” ইন্সট্যান্ট একটা হাসি এসে যায় । অপ্রতিরোধ্য ।  

 ছাত্রছাত্রীরা নিজেরাও অনেক সময় কনফেশন করতে আসে আমার কাছে। একজনের শুকনো মুখ দেখে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “ কী হয়েছে তোমার ?” সে কিন্তু কিন্তু করে বলল, “ মন্দিরা, একটা ভুল করে ফেলেছি। একজন আমাকে হাওড়া স্টেশনে ট্রেনে সুটকেস তুলতে সাহায্য করেছিল। আমি ‘ ধন্যবাদ, ধন্যবাদ’ বলতে গিয়ে ‘ দোকানদার’, ‘ দোকানদার’ বলেছি।  

 অনেক সময় আমি কোনো কোনো ভুলের মাথামুন্ডু পাই না । একজন ছাত্র বহু বছর আগে একটা বাক্য লিখেছিল, “ এক চড়ে দোকান ঘুরিয়ে দেব ।“ সে যে কী বলতে চেয়েছিল আজও ঠিকমত বুঝে উঠতে পারি নি । কিন্তু বাক্যটাও ভুলতে পারি নি ।


নামমাহাত্ম্য

নামমাহাত্ম্য আর কাকে বলে !!

আমার জীবনের টিউশনি-কালে আমি ছোটো দুটো বাচ্চা ছেলেকে কাঁকুরগাছিতে পড়াতে যেতাম। কাঁকুরগাছির মোড় থেকে রিকশায় উঠে যদি বলা যেত, ' বালতি কারখানা'য় নিয়ে চলুন' রিকশাওয়ালারা সেখানে নিয়ে যেত। সেই বিশাল টিনশেডে আর বালতি বানানো হত না, কিন্তু সব রিকশাওয়ালারা ওই জায়গা চিনত। বালতি কারখানার খুব কাছেই ছিল শাওন-মল্লারদের ( আমার ছাত্রদুটি) বাড়ি। আর কোনো ল্যান্ডমার্কের প্রয়োজন হয়নি কখনো। ওদের বাড়ির ঠিকানাও আমি জানতাম না। একদিন বাবা-মা ওদের বাড়িতে বেড়াতে গেছেন। কিন্তু ট্যাক্সি করে। ট্যাক্সিওয়ালা ওই এলাকায় ঘুরে ঘুরে হয়রাণ, ' বালতি কারখানা' বললে কেউ বোঝে না। অনেক কষ্টে শেষে পৌঁছেছিলেন আর আমার ওপর খুব রাগ-মাগ করেছিলেন, " কীসব বলিস যে তুই । একটা ঠিকানাও দিসনি। বালতি-কারখানা আবার কী " ইত্যাদি ।

কাল রাণুর কাছে আর একটা এরকম গল্প শুনলাম। শিবপুরে ওদের পাড়ায় নাকি ছিল, "পায়খানার বাগান"। বাগান বলতে ছোটোবেলা থেকে আমার কাশ্মীরের 'চশমাশাহি' ইত্যাদি বাগানের কথা মনে আসে, আর কল্পনায় দেখি সম্রাট জাহাঙ্গীর পাগড়ি পরে গোলাপ হাতে সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। মনের মধ্যে সেই দৃশ্যটা কাল নষ্ট হয়ে গেল। যাই হোক, ধরে নিচ্ছি, একটা খোলা জায়গায় সবাই বড়বাইরে করত বলে এরকম নাম হয়েছিল । সময় বদলাল, নামের চাপ কিন্তু গেল না। পরে সেখানে যখন বাড়ি উঠে গেল, তখন তার নাম হল, "পায়খানার বাগানের বাড়ি", আর সেই বাড়ির লোকদের বলা হত, " পায়খানার বাগানের লোক "।


পুরনো কাগজ

দশ বছর আগে, ২৫শে আগস্ট,‌ আমি সাঁইতিরিশ বছর বয়সে দুটো সুটকেস নিয়ে একটা হলুদ রঙের সালোয়ার -কামিজ পরে প্লেনে চেপে জীবনে প্রথম বিদেশে গেছিলাম। নেহাত, প্লেনে চাপলে ভুল স্টপেজে নামা যায় না, বা চট করে হারিয়ে যাওয়া যায় না, সেই সৌভাগ্যে আমি ঠিকঠাক মিশিগানের ডেট্রয়েট এয়ারপোর্টে পৌঁছতে পেরেছিলাম। প্রথম কয়েক বছর শুধু একটাই সিনেমা দেখতাম, টম হ্যাঙ্কের ' কাস্ট এওয়ে'। একটি নির্জন দ্বীপে আটকে পড়া একজন মানুষের কাহিনী। অ্যামেরিকার একটা নামকরা ইউনিভার্সিটি-শহর অ্যান আরবারে থাকতে গিয়ে আমার এমনই মনে হত।
আমি অ্যান আরবার থেকে বড় শহর শিকাগোতে চলে গিয়েছি অনেক বছর আগে। এখন হাবিজাবি অনেক অভ্যেস অজান্তে গেড়ে বসেছে। আমার কলকাতার জীবনের বিপরীতে এখন চুপচাপ, শান্ত, স্বাধীন জীবন কাটাতেই ভালো লাগে আমার। বেশি কথা বললে মাথা ধরে, গলা শুকিয়ে যায়। এখন পুরো ‘ধোবিকা গাধা’ । এখন কফিপ্রিয়, বাংলা বলা, নন-রেসিডেন্ট এলিয়েন আমি । এখন বরফে অভ্যস্ত হয়ে গেছি, অথচ জোর গলায় বলি যে বরফ ভালো লাগে না, বৃষ্টি ভালো লাগে। আমি প্রবাসী বাঙালির সিন্থেটিক জীবন-যাপনকে বহোত ডরাই অথচ আমি নিজে জানি না সেটা কী । আমি বুঝেও বুঝতে চাই না যে প্রতিদিনের জল-হাওয়া যদি গায়ে না লাগে, সেই জায়গা থেকে অজান্তে, আলগাভাবে আমি সরে যেতে বাধ্য।
আমি দু নৌকায় পা দিয়ে, যদ্দূর যাওয়া যায়, যেতে চাই।
এই ছবিটা হল আমার প্রথমবার অ্যামেরিকা যাওয়ার (২০০৪) আগে, বাবা আর আমার তৈরি প্ল্যান-প্রোগ্রাম । মা এতদিন পরে এই কাগজটা খুঁজে পেয়ে আমাকে দিলেন।

10644656_10154486879890363_1137665818836765448_o


কানে শুনি না

প্রচুর ভুলভাল শুনি। মানে , কানে শুনি না এক কথা, আর সম্পূর্ণ ভুল শুনি, সে আর এক কথা। 'অটোগ্রাফ' সিনেমার একটা গানের দুটো লাইন এতদিন ভাবতাম, " চল রাস্তায় সাজি ট্রামলাইন, আর কবিতায় শুয়ে কাটলেট', দুএকবার সন্দেহ হলেও মনে করতাম, হতেও পারে এরকম। কাটলেট আর কবিতা একেবারেই কি যাবে না ? এখন ভালো করে শুনে দেখি, " রাস্তায় সাজি ট্রাম লাইন আর কবিতায় শুয়ে couplet " । এই বছর দুইয়ের মধ্যে আর একটা মারাত্মক ভুল হল, ট্যাক্সিতে করে আমার বোন, বোনের আট-নয় বছরের ছোট্টো মেয়েটা আর আমি চলেছি। বোনের মেয়েটা খুব সুন্দর গান করে, ও আমাকে চুপিচুপি , নিচু স্বরে বলল, " মম চিত্তে, নিতি নৃত্যে..." আমি চমকে, চেঁচিয়ে বলে উঠলাম, " বমি পাচ্ছে ? বমি পাচ্ছে ?? ও দোলন, ( আমার বোন ) , দেখ, দেখ, গুলু ( বোনের মেয়ে) বমি করবে রে।" যদি আজকাল শুধু এরকম হত, তাও কথা ছিল। স্কুলে পড়ার সময় এক বন্ধুকে ফোন করেছি, দেখা করব কিনা কালকে, এই নিয়ে কথা হচ্ছে, আমি শুনলাম ও বলছে, " কাল হবে না, কাল হেমন্তর নাচ আছে রে।" আমি বেজায় ঘাবড়ে গেলাম। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ফাংশনে গান করতেন, নাচও শুরু করলেন নাকি ? কিন্তু শুনেছিলাম, ওঁর আবার আর্থারাইটিস আছে।শেষমেষ বোঝা গেল ও বলছে, " কাল নেমন্তন্ন আছে, নেমন্তন্ন আছে..."।


হারানোর গপ্প

অনেক হারানোর গপ্প শুনেছি ভাই, এরকমটি আর শুনিনি।

" ...এখান থেকে কালীঘাটের দিকে এগোলাম...।এ পাড়ায় গলিতে গলিতে পুজো। লাউড স্পিকারে ' মেহবুবা, মেহবুবা' গানের সঙ্গে নানারকম ঘোষণা চারদিক থেকে আসায় আমার কর্ণেন্দ্রিয়ের অবস্থা সঙ্গীন। তারই মধ্যে একটি ঘোষণা শুনে থেমে গেলাম। ' হাওড়ার রামরাজাতলার শ্রীমতী সুখরানী শিকদারের খোঁপাটি খসে পড়ে হারিয়ে গেছে। যদি আপনাদের মধ্যে কেউ পেয়ে থাকেন অবিলম্বে আমাদের অফিসে কিংবা কোনো স্বেচ্ছাসেবকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।' "

---- পরিতোষ সেনের ' মন্ডপে মন্ডপে' প্রবন্ধ। ( বইয়ের নামঃ রং, তুলির বাইরে)।


ব্যায়াম ও গান

মাঝে মাঝে খুব অদ্ভুত অদ্ভুত ঘটনা ঘটে । কলকাতায় বোনেদের প্রায় নতুন অ্যাপার্ট্মেন্টে গেছি। আমার বোন দোলন খুব উৎসাহ করে আমাকে ওদের হাউসিং কমপ্লেক্সের জিমটা দেখাতে নিয়ে গেল। আমি মোটে এইসব আখড়া-মাখড়ায় যাই না। আমার দমও নেই, উৎসাহও নেই। জিমের দরজার কাছে গিয়ে উঁকি মেরে চলে আসতে যাচ্ছি, দোলন 'আয় না, আয় না' বলে ভেতরে ডেকে নিয়ে গেল। দেখি একজন খুবই বেঁটে ভদ্রলোক হাফ প্যান্ট পরে মুগুর টাইপের কী যেন ভাঁজছেন, আর ব্যাকগ্রাউন্ডে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গলায় গান চলছে, " ঘুম ঘুম রাত, ঝিকিমিকি তারা, এই মাধবী রাত..." । আচ্ছা, এই গানের সঙ্গে ব্যায়াম-ট্যায়াম করা যায় ? কী জানি ভাই, অনেকের গানের চয়েস কেমন যেন। অনেক দিন আগে আমার বন্ধুর বিয়েতে খেতে গেছি, মাইকে বাজছিল, " জীবনে যদি দীপ জ্বালাতে নাহি পারো, সমাধি পরে মোর জ্বেলে দিও।" আমরা অবশ্য গা না করে খেয়ে দেয়ে তাড়াতাড়ি চলে এসেছিলাম।


সুটকেস ও আমি

কলকাতায় আমার বিদেশী ছাত্রছাত্রীদের মুখে শুনতাম, “ আর পারি না মন্দিরা, এই দুটো সুটকেস নিয়ে জীবন কাটানো।“ “ কোথাও থিতু হতে চাই...” , এইসব কথার মানে আমার মাথায় ঠিক ঢুকত না। আমি দেখতাম ছাত্রছাত্রীদের বাক্সে অচেনা দেশের দাগ । মনে হত আমারও দুটো সুটকেস চাই, আমিও অন্য দেশে গিয়ে অন্য মানুষদের চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে এই কথা বলব, “ আর পারছি না...এই দুটো সুটকেসে জীবন কাটানো...”

সুটকেসে কী নিয়ে যেতে হবে, এরকম একটা ধারণাও একসময় মনে স্থির হয়ে গেছিল। আমার ছেলেবেলার বন্ধু বুবাই নব্বইয়ের দশকের প্রথম দিকে যখন অ্যামেরিকায় এসেছিল পড়াশোনা করতে , অনেক ক্যাসেট নিয়ে এসেছিল। বুবাইয়ের আসার আগের দিন ওর বাড়ি গিয়ে দেখি বাড়ি ওলট-পালট। সুমিত্র আর বুবাই পাগলের মত ক্যাসেট কপি করে যাচ্ছে। আমার সেই থেকে হালকা রঙিন এক ইচ্ছে জন্মাল মনে – আমি সুটকেস নিয়ে বিদেশ যাব, আর যাবার আগে ক্যাসেট কপি করে নিয়ে যাব।

কিন্তু বিদেশ যাবার ইচ্ছে সেইরকমভাবে কখনো দানা বাঁধতে পারে নি, তার প্রধান কারণ ছিল হয়তো আমার পেশাটা – বিদেশীদের বাংলা পড়ানো । অ্যামেরিকায় বাংলা পড়ানো আর চাঁদে গিয়ে তরমুজ বা গাজর ফলানো একই ব্যাপার । কিন্তু মাথায় ছিল সুটকেসে কী কী থাকবে...

২০০৪ সাল। আমি অ্যান আরবার, মিশিগানে আসছি। ক্যাসেটের দিন প্রায় শেষ। আমার সুটকেসে তখন সিডি ।

এখন সুটকেস প্রেম ঘুচে গেছে আমার। সকালে উঠে গাছে জল দিতে ভালো লাগে ।

10010483_10155108955975363_205714166950166725_o


কোট হারানো !!

ফেব্রুয়ারি ২, ২০১৫

 শিকাগোর এই শীতের সকালে আমাদের ছোট্টো ডিপার্টমেন্টের ছোট্টো বাথরুম থেকে কে আমার ছেঁড়া কোট চুরি কল্লে, জানা হল না।

কোটহারা আমি করিডোরে " হে বিপত্তারণ, হে জগৎপতি, হে দীননাথ, অভাগারে রক্ষা করো" টাইপের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দিয়ে ছুটছুটি কল্লাম একটু। তারপর আমাদের অ্যাডমিনিস্ট্রেটর অ্যালিসিয়ার ঘরে গিয়ে জানালুম। সেখানে দেখি, অন্য এক ডিপার্টমেন্টের অ্যাডমিনিস্ট্রেটর অ্যান বসে আছে। সে বলল, " প্রফেসর থিয়োডোরেরও এরকম হয়েছিল...সে এক ভয়ংকর শীতের সন্ধ্যায়...চরম ঠান্ডা ছিল সেদিন..." আমি আর কথা বাড়ালাম না, সেই থিয়োডোর হয়তো এতদিনে মরে হেজে গেছে আর সেই সন্ধ্যা ছিল তার শেষ সন্ধ্যা । তবে যে কজনকে কাঁদো কাঁদো হয়ে দুঃখের কথা বল্লুম, সবাই বলল, " আরে একটা ট্যাক্সি ডেকে নাও। ডোর টু ডোর। " কিন্তু আমার ধারণা ওই দরজা দিয়ে বেরিয়ে ট্যাক্সিতে উঠতে উঠতেই আমার ডবল নিউমোনিয়া আর হুপিং কফ হয়ে যাবে। মরীয়া হয়ে রাণুকে ফেসবুকে মেসেজ কল্লাম, ইংরেজি -বাংলা ফন্টের গোলযোগে মেসেজটা এরকম দাঁড়াল, " উরগেন্ত !! আমাকে ফোন ব্যাক কার।"

বিপত্তারণ ইন্টারনেটের মাধ্যমে খেলাটা খেললেন।

ফেসবুকে ঢাকার এক বন্ধুকে পেলাম। সেই ঢাকার বন্ধু স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রাণুকে ফোন করল ।
রাণু সায়ন্তনের কোট নিয়ে ( গা থেকে খুলে নয়, সায়ন্তন একটা এক্সট্রা কোট রাণুর আপিসে রেখে গিয়েছিল) আমার আপিসে এল। ততক্ষণে আমি আমার অকাল প্রয়াণে পৃথিবীর কতখানি ক্ষেতি হয়ে যাবে, সে নিয়ে ভাবনাচিন্তা করে ফেলেছি।

আজ আমি কলকাতা-ঢাকা- শিকাগোর নেটওয়ার্কের ফলে এক রোমহর্ষক মৃত্যু থেকে বেঁচে গেলুম !!!!!

10887178_10155112875605363_4206517675579319105_o


কোহিনুর মণি ও জীবন

ছোটোবেলায় রূপকথার গল্প আমার মনের ওপর খুব প্রভাব ফেলত। কারোর মনে আছে ‘ ঠাকুরমার ঝুলি’র সুখু-দুখু, দুই বোনের কথা ? চাঁদের মা বুড়ির কাছ থেকে দুখু বড় বড় বাক্সের লোভ না করে ছোট্ট একটা ‘ খেলনা-প্যাঁটরা ‘ নিল। আর তার জীবন কী সুখেরই না হয়ে গেল। বনের পশু-পক্ষী , গাছ-পালা সব্বাই তাকে কত উপহার দিল। একটা চমৎকার রাজপুত্রও পেয়ে গেল সে। আর তার সৎবোন সুখু ? সে লোভে পড়ে যেই একটা বড় প্যাঁটরা নিয়েছে, ব্যস, রাতে সেই প্যাঁটরা থেকে রাজপুত্রের বদলে অজগর বেরিয়ে এসে তাকে খেয়ে নিল। মনের মধ্যে বড় আতংক ঢুকে গেছিল। আর ওই অল্পবয়সে বেশ বুঝে গেছিলাম গল্পের মোদ্দা কথাটা , “ বেশি লোভ করতে নেই।“

কিন্তু জীবনে বড় ধাক্কাটা খেয়েছিলাম তারপরেই। আমার পিসতুতো দাদা জাপান থেকে ঘুরে এসে আমার আর আমার জ্যাড়তুতো বোন শান্তার সামনে দুটো বাক্স রেখে বলেছিল, কে কোনটা নিবি ? রাক্স ( আমি), তুই বেছে নে।“ আমি তো রূপকথা পড়া লায়েক তখন । ছোট বাক্সটা বেছে নিলাম । শান্তা পেল বড় বাক্স। শান্তার বাক্স থেকে বেরলো একটা অতীব সুন্দর পুতুল আর আর আমার বাক্স থেকে বেরলো একটা ছোট্টো রূপোলী ট্যাংক । ট্যাংক ? ওসব তো ছেলেরা খেলে । ওটা একটা খেলার জিনিস হল ? ‘ঠাকুরমা’র ঝুলি’র ওপর বেজায় রাগ হয়েছিল আমার। ওই শোক কখনো যায় নি ।

টিভিতে আমার কিশোর বয়সে একটা সাক্ষাৎকার দেখেছিলাম । বাহদুর শাহ জাফরের বর্তমান এক বংশধরের সাক্ষাৎকার । তিনি তাঁর পরিবারসহ দিল্লীর এক বস্তিতে থাকেন । রিকশা চালান । কারোর অধীনে তিনি চাকরি করতে পারেন না কারণ তিনি বাদশাহের বংশধর । তাঁরা লেখাপড়াও বিশেষ জানেন না । তাঁর স্ত্রী দীপ্ত, ইষৎ ককর্ষ কন্ঠে কথা বলতে বলতে অতীব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে একবার বলে উঠলেন, “ সরকারের তো আমাদের জন্য কিছু করা উচিত, কম-সে-কম কোহিনুর মণি তো দিতে পারে ? “

‘কম-সে-কম’ কোহিনুর মণি ? মহিলা বলেন কী ? দুখু-সিনড্রম থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম ঠিকই, কিন্তু তাবলে এতটা ঠিক ইয়ে করতে পারি নি । ঘটনাটা আজ থেকে প্রায় তিরিশ-পঁইত্রিশ বছর আগের ।
আজ মনে হয় সত্যিই তো, চাইলে জীবন থেকে কোহিনুর মণিই চাওয়া উচিত । ওর কমে জীবনের সঙ্গে কখনো ফয়সালা করতে নেই।

Untitled, 9"X9",mixed media,2013, Mandira Bhaduri

10945886_10155117939450363_6047250908563923965_o


অভ্যাস

সুদিনের বন্ধু সুর্যর মুখে কমল মিত্রকে নিয়ে অ্যান আরবারে একটা গপ্প শুনেছিলাম । কমল মিত্র আর উত্তমকুমার কোনো সিনেমায় থাকলেই নাকি একটা পেটেন্ট ডায়লগ থাকত । সিচুয়েশনটা হত এইরকম, উত্তমকুমার বলতেন, “ বাবা, আমি ‘অমুক’কে বিয়ে করতে চাই।“ আর কমল মিত্র কলকাতার গরমে, ড্রেসিং গাউন পরে পাইপ চেবাতে চেবাতে প্রবল প্রতাপের সঙ্গে বলতেন, “ বেরিয়ে যাও !!”

কিন্তু এবার একটা নতুন সিনেমা, নতুন রকমের সিন । বাবা কমল মিত্রকে স্নেহছলোছলো হয়ে ছেলে উত্তমকে বলতে হবে, “ বাবা, এসো, কাছে এসো। “ কিন্তু এতদিনের অভ্যাস, কমল মিত্র আর নতুন ডায়লগে যেতে পারছেন না। বলে ফেলছেন, “ বেরিয়ে যাও’। সবাই উদ্বিগ্ন । বারবার টেক হয় আর কমল মিত্র উত্তমকুমারকে কিছুতেই বলতে পারেন না, “ বাবা, কাছে এসো ।“

আমার অনেকটা ওরকম অভ্যাসজনিত সিচুয়েশন তৈরি হয়েছে। অন্য রকম লেখা লিখতে চাই মাঝে মাঝে। কিন্তু হাসি-ঠাট্টা করা- লেখার মধ্যে বসে গেছি। জীবনে ঘুরেফিরে ছোটো ছোটো মজার ঘটনা চোখ কেড়ে নেয় । সিরিয়াস লেখা লিখতে চাইলেও হয়ে ওঠে না । এখানে কে যেন আমার নাম দিয়েছে, ইউনিভারসিটি অফ শিকাগো’র রেসিডেন্ট লালমোহনবাবু ।

আমার মনের ভেতরের কমল মিত্তির ক্রমাগত রিটেকের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু অভ্যাস বদলাতে পারছেন না ।

 

6"X 8",acrylic on a board, 2012, Mandira

 

1102415_10155121513690363_5136324853039292428_o


দর্জির দরজায়

আমি শাড়ি পরি না ব্লাউজ পরবার ভয়ে । না না, তার মানে এই নয় যে আমি ব্লাউজ ছাড়াই শাড়ি পরতে চাই। গল্পটা ওই দিকে যাচ্ছে না । আসলে কেনা ব্লাউজ গায়ে ঠিক হয় না, আমি শেলাই করতে ভালোবাসি না । আর দর্জিদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক বিশেষ ভালো নয় । ছোটখাটো ঘটনা বাদই দিলাম, একজন দর্জি আমার সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল আমার বোনের বিয়ের সময় । বেশ আগে থেকে মাপ টাপ দিয়ে এসেছিলাম, বেনারসী শাড়ির সঙ্গে বেনারসী ব্লাউজ। বোনের বিয়ের আগের দিন ব্লাউজ নিতে গিয়ে ট্রায়াল দেওয়ার সময় দেখি ওই ভয়ানক বস্তুটা পরে আমি দু ইঞ্চির বেশি হাত তুলতে পারছি না। অনেক কাকুতি মিনতি করলাম যে যদি ঠিক করে দেওয়া যায় একদিনে। দিল তো নাই, ব্যাজার মুখে বলল, “ আপনার স্ট্রাকচারে গন্ডগোল আছে, আমাদের ক্যালকুলেশনের সঙ্গে মিলছে না ।“ ক্যালকুলেশন-টেশন শুনলে আমি আবার ভয় পেয়ে যাই। গোলমাল না করে ওটা নিয়ে বাড়ি এলাম, উপায় নেই। বোনের বিয়ের দিন ওটা পরে পুরো পঙ্গু হয়ে গেলাম । বিকেলের দিকে একজন দয়া করে চুল বেঁধে দিল । আমি সৈনিকের স্টাইলে দুহাত পাশে রেখেই সারা সন্ধ্যে কাটালাম । লিপস্টিক – কাজল ইত্যাদি লাগানো হল না । কারোকে হাত তুলে নমস্কারও করি নি । কে যেন বলেছিল, “ তুমি সারা সন্ধ্যে সব নিমন্ত্রিতদের বলছিলে ‘ আমি আপনাকে ঠিক চিনতে পারছি না, আমি আপনাকে ঠিক চিনতে পারছি না ।‘ বগলে অমন যন্ত্রণা নিয়ে পৃথিবীর কারোকেই চেনা যায় না, এটা ভাই সত্যি কথা ।

আমি স্মৃতিটাকে ব্লক করে দিয়েছিলাম । কিন্তু সম্প্রতি পিকাসোর দুঃখের কথা পড়তে গিয়ে আমার নিজের কথা মনে পড়ে গেল। ওনার প্রেমিকা ফ্রাঁসোয়া জিলোর স্মৃতিকথা ‘ লাইফ অফ পিকাসো’য় আছে যে পিকাসো দর্জিদের কাছে যেতে খুব ভয় পেতেন। ওনার আঁকা-টাকা বন্ধ হয়ে যেত। ওনার দর্জি বলত, “ বুঝলেন মঁসিয়ে, আপনার জামাকাপড় তৈরি করা খুব মুশকিলের ব্যাপার। আপনার শরীরের ওপর দিকটা চওড়া , কিন্তুআপনি খুবই বেঁটে লোক।‘ পিকাসো গুটিয়ে কেঁচো হয়ে যেতেন।

সেইজন্য ভালো দর্জিদের খুব কদর । আমার বন্ধু সুস্মিতা আমাকে বলেছে যে নাগেরবাজারে একটা ব্লাউজের দোকান আছে। সেখানে সকাল আটটা থেকে লাইন পড়ে। দূর দূরান্ত থেকে মহিলারা আসেন। তাদের টোকেন দেওয়া হয় । এগারোটা থেকে সেই টোকেন দেখে রুগি দেখা – থুড়ি, মাপ নেওয়া শুরু হয় । শেষ হতে হতে বিকেল গড়িয়ে যায় ।

দর্জিদের সঙ্গে আমার সম্পর্কের জটিলতার কারণেই আমি একটা খুব বাজে রকমের ভুল করে বসেছি । আমার বাংলা ওয়ার্কবুকে একটা দর্জির গল্প আছে, আমি চেতনে নাকি অবচেতনে সেই দর্জির চোখে কালো চশমা বসিয়ে দিয়েছি । এর ফল নানারকম হতে পারে। আমার অ্যামেরিকান ছাত্র-ছাত্রীরা ভাবতে পারে, ইন্ডিয়ায় দর্জিরা কালো চশমা পরে, কেউ ভাবতে পারে, অন্ধদের দিয়ে জোর করে দর্জির কাজ করানো হয় । এই চ্যাপ্টারটা এলেই আমি ছাত্র-ছাত্রীদের মনটা বেশি করে জটিল গ্রামারের দিকে ঘুরিয়ে দিই । যদি কখনো মনস্ত্বাত্তিকের কাছে যাই, তাহলে ছবিটা সঙ্গে নিয়ে যাব। আমার মনের গোপনে দর্জিদের প্রতি প্রতিশোধস্পৃহার সঙ্গে এই ছবির সম্পর্ক জানতেই হবে আমাকে।


আমার শিল্পচর্চাঃ পর্ব ১

আমার শিল্পচর্চাঃ পর্ব ১

স্কুলে আমরা আঁকা শিখতাম ? মনে হয় আমাদের আঁকার ক্লাস ছিল একটা । কিন্তু টিচার ক্লাসে এসে বোর্ডে একটা আম এঁকে দিতেন। আমরাও সেই আম তাড়াতাড়ি কপি করে নিজেদের মধ্যে গল্প করতাম। সেই শিক্ষিকা আবার অন্য বিষয়ও পড়াতেন, তাঁকে হয়তো জোর করে আঁকার ক্লাস দেওয়া হয়েছিল। অন্য ফলের কথা বলতে পারব না। তবে চোখ বুজে আম এঁকে দিতে পারি। আমার ধারণা বেথুন ইস্কুলের আমার ব্যাচের সব ছাত্রীরাই সব রকম ফলের মধ্যে সবচেয়ে ভালো আম আঁকতে পারে।

সেই আম আঁকার স্কিল নিয়ে ক্লাস নাইন না টেনে আমার ওপর শকুন্তলার জীবনকাহিনী একটা চার্ট পেপারে এঁকে দেবার দায়িত্ব পড়েছিল। বোধহয় কী যেন একটা শিল্প –বিজ্ঞান মেলা জাতীয় কিছু একটা ছিল। আমার চার্টে শকুন্তলা জন্মাল, বড় হলো, হরিণছানা-টানা, গাছপালা এসবই ছিল। এই ছবি, ওই ছবি থেকে ফিগার টিগার নিয়ে কষ্টেসৃষ্টে আঁকলাম । ঝামেলা বাঁধল শকুন্তলা যখন একটা পুত্রসন্তানের জন্ম দিল। সদ্যজাত শিশুর ছবি পাওয়া খুব মুশকিল। আমার পুঁজি ছিল কয়েকটা রূপকথার বই, মন্দিরগাত্রের মূর্তি দিয়ে বানানো কয়েকটা গ্রিটিংস কার্ড আর ‘দেশ’ পত্রিকা। ‘দেশ’ পত্রিকায় তো শুধু দুতিন বছরের শিশু দেখা যায় পাউডার, ক্রিম, গুঁড়ো দুধের বিজ্ঞাপনে । সময় আর নেই, পরের দিন চার্টটা জমা দিতে হবে। মরীয়া হয়ে আমি প্রায় এক বছরের বাচ্চা হাসিমুখে হামাগুড়ি দিচ্ছে , এমন একটা ছবি দেখে দেখে এঁকে ফেললাম, তারপর গম্ভীর মুখে সেটাকে কেটে উলটে শকুন্তলার হাতে শুইয়ে দিলাম। মুশকিল হল এই যে হামাগুড়ি দেওয়া উল্টোনো বাচ্চার হাত থাকলো শূন্যে সোজা হয়ে, পা ভেঙ্গে রইল একটা অদ্ভুত এঙ্গেলে। আর সে কি সাইজ বাচ্চাটার । শকুন্তলার সাইজের সঙ্গে ঠিক ব্যালেন্স করতে পারি নি। শকুন্তলা বাচ্চার পিছনে ঢেকে গেল । খুব মন দিয়ে দেখলে শকুন্তলার একটা চোখ বা ঠোঁটের একটু দেখা যেতে পারে, এমন ব্যাপার। 
পরের দিন ওই ছবি দেখে আমাদের বাংলা টিচার জ্যোৎস্নাদি কেঁদে ফেলেন আর কী। উনি ভীষণ রাগী ছিলেন, রাগে-দুঃখে ফোঁস ফোঁস করতে করতে বললেন, “ শকুন্তলার কোলে ওটা কী ? মানুষের বাচ্চা ? শুয়োর মনে হচ্ছে যে । এ সদ্য জন্মেছে বলে তোমার মনে হল ? এত বড় ? আমার নাম ডোবালে তুমি মন্দিরা । কী হবে এখন ?”

কিচ্ছু করা যায় নি। ওই ছবি টাঙানো হল। তারপর কী হল, কে দেখল, কিছু মনে নেই। আশা করি আমার বন্ধুদের কারোর কিছু মনে নেই।

এইজন্য সবাই যখন জিজ্ঞেস করে ‘ছোটোবেলায় ছবি আঁকতে?’ আমি অম্লান বদনে বলি, ‘না’ ।


এই ব্লগ নিয়ে খাব না মাথায় দেব এখনও জানি না। তবে বন্ধুবান্ধবদের চাপে পড়ে এখানে ফেসবুকের লেখা জমা করছি। বাকিটা পরে দেখা যাবে ।